এমপি-পুত্র আশার কাঁধে ভর দিয়ে হিরনের গোপন খেলা
কখনও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, আবার কখনও স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম; অবশেষে হাত মিলিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্যের পুত্রের সঙ্গে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য এবং আওয়ামী লীগের বিতর্কিত ও প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার মতো একের পর এক গুরুতর অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছেন বন্দর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম হিরন। তার এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের মাঝে।
দলীয় সূত্র জানায়, হিরন কখনও বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় টিমের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ, আবার কখনও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছেন। ২০২৫ সালের ৮ মে তার একটি সংবেদনশীল অডিও ফাঁস হয়, যেখানে এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ওসির নাম ভাঙিয়ে মামলা বাণিজ্যের জন্য টাকা দাবি করতে শোনা যায়।
এ ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হলেও মহানগর কমিটির সদস্য সচিবের মধ্যস্থতায় সে যাত্রায় তিনি পার পান। শোকজের চিঠি গণমাধ্যমে এলেও তার দেওয়া উত্তর কখনোই প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি মুসাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন আহমেদসহ শীর্ষ স্থানীয় বিএনপি নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে হিরনকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। তার বিরুদ্ধে দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির নানা চিত্র তুলে ধরা হয়। তখন এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে হিরন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে নিয়ে চরম অসত্য বক্তব্য দিয়ে দলকে বিব্রত করেন।
তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে তিনি আন্দোলন থেকে দূরে থাকেন। সে সময় ধামগড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাসুম আহম্মেদ ও তার ভাতিজী জামাই মদনপুরের যুবলীগ নেতা অহিদুজ্জামান অহিদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তবে ৫ আগস্টের পর রহস্যজনকভাবে ‘সুস্থ’ হয়ে উঠে মাঠে নেমে দখলের রাজনীতি শুরু করেন তিনি। সম্প্রতি মদনপুরের বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা খলিল মেম্বারকে দলে ভিড়িয়ে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
মার্কেট দখলের প্রতিবাদে ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করেন ‘একতা সুপার মার্কেট মালিক বহুমুখী সমবায় সমিতি’র নেতৃবৃন্দ। সমবায় সমিতির বৈধ সদস্য না হয়েও হিরন সমবায় অফিস ও ব্যবসায়ীদের লাগাতার হুমকি দিয়ে আসছিলেন।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্যের পুত্র আবুল কাউছার আশা এবং আজমেরী ওসমানের সহযোগী আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ট খলিল মেম্বারের সশস্ত্র বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ‘একতা মার্কেট’ দখল করেন হিরন। বর্তমানে বিতর্কিত মনির বাহিনীকে সামনে রেখে দখলকৃত মার্কেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।
এছাড়াও মদনপুর ফুলহরে যুবলীগ নেতা অহিদুজ্জামান অহিদের ইটভাটায় অবৈধ গরুর হাট বসানোর পেছনে হিরনের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। ওই বছর হাট পরিচালনা থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে আজমেরী ওসমানের এক সহযোগীর বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখার গুঞ্জনও রয়েছে।
স্থানীয় তৃণমূল ও ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, তার এসব কর্মকাণ্ডে পুরো মদনপুর ও বন্দর এলাকায় বিএনপি শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মূল বার্তা ছিল জনগণের কাছে যাওয়া, কিন্তু হিরন উল্টো পথে হেঁটে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। একইসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের ক্লিন ইমেজ নষ্ট করা এবং তার পুত্র আবুল কাউসার আশাকে বিভ্রান্ত করার মিশনে নেমেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, বিগত সংসদ নির্বাচনে হিরন অন্তরালে আবুল কালামের বিরোধিতা করে ‘ফুটবল’ প্রতীকের প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের পক্ষে ক্যাসেল রেস্টুরেন্টে একাধিক গোপন বৈঠক করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আওয়ামী লীগের দোসরদের সাথে আঁতাতকারী হিরনের তাণ্ডব বন্ধে বিএনপির হাইকমান্ড ও প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন