ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বলপ্রয়োগ ও দলীয়করণের অভিযোগ পাওয়া গেছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বলপ্রয়োগ ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় মগবাজারস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য জনাব আতাউর রহমান সরকার।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন , ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, ভোট দেওয়ার আগেই ভোট প্রদান হয়ে গেছে বলে আমরা এখন পর্যন্ত তথ্য পেয়েছি। ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বাচনী এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা এবং নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র না থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় গভীর উদ্বিগ্ন আমরা। এজন্য নির্বাচন কমিশন, ঠাকুরগাঁওয়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতি অবশিষ্ট সময়ের ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সরকারদলীয় শীর্ষ পদ থেকে এ উপনির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করা হলেও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ধরনের বক্তব্য জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনের আগে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নয় দফা লিখিত অভিযোগ ও তিনটি দাবি পেশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকেও নির্বাচন কমিশনের কাছে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি আমরা। কিন্তু এসব অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার দৃশ্যমান হয়নি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাইরুজ ইসলামের বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করা হলেও তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়নি। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। এমনকি একজন নারী ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন, তার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সেক্রেটারি জেনারেল।
এ ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের মধ্যে বিশেষভাবে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে কাজ করলে চাকরিতে সমস্যার মুখে পড়তে পারেন—এমন ইঙ্গিত দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো এবং ধানের শীষ প্রতীক রঙিনভাবে ব্যবহারের অভিযোগের ছবি নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আমাদের নেতাকর্মীদের মারধর করে আহত করা, নারী ভোটারদের বাধা দেওয়া এবং নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র বা পরিচয় শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যাজ দেখা যায়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কোনো কোনো কর্মকর্তা যথাযথ পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি। কয়েকটি ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ভোটারকে ব্যালট দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিল ও স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার কথা। আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখার ফলে জাল ভোটের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্বাচনী এলাকায় অর্থ বিতরণও করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরিচয় ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাসহ এসব ঘটনাগুলোর তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেছিলাম আমরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বেশি থাকলেই নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ভোটারদের নিরাপত্তা, জাল ভোট প্রতিরোধ এবং ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনীর কার্যকর ভূমিকা থাকতে পারত।
তিনি বলেন, একটি উপনির্বাচনেই যদি অনিয়মের অভিযোগ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন কীভাবে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
আপনার মতামত লিখুন