গুজবের বলি ভোলাহাট: বাড়িঘরে আগুন, সংঘর্ষে প্রাণহানি
পূর্ব শত্রুতা এবং ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জেরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ জুন শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার দলদলী ইউনিয়নের বটতলা গ্রামে এ সহিংসতা ঘটে। এতে আসাদুল ইসলাম (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত ও অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেক পুরুষ গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন।
সংঘর্ষের সূত্রপাত: স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত রমজান মাসের তৃতীয় রোজায় একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবাদের সূত্রপাত। ঐ দুর্ঘটনায় দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তি আহত হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় আসাদুলের পরিবারের সদস্যদের আসামি করা হয়। ঘটনার দিন সকালে ঢাকা থেকে ফিরে আসাদুল ও তার আত্মীয়রা প্রতিপক্ষ ইলিয়াস ও তার জামাতা বাবলুর ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে।
গুজব ও সহিংসতা: আহত ইলিয়াস ও বাবলু মারা গেছেন—এমন একটি গুজব দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। ক্ষুব্ধ জনতা আসাদুল ইসলাম, তার ভাই আশরাফুল ও আবু তালেবের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় তিনটি বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন নেভাতে আসা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও উত্তেজিত জনতা বাধা প্রদান করে। অগ্নিকাণ্ডে আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও মোটরসাইকেলসহ মূল্যবান মালামাল ভস্মীভূত হয় এবং ঘরবাড়িতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে বলে জানা গেছে।
নিহত ও আহতদের তথ্য: ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল ওয়াজিদ ফরহাদ জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় মোট ১২ জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ৬ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। গুরুতর আহত আসাদুল ইসলামকে রাজশাহীতে নেওয়ার পথে অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের বক্তব্য ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ: ভোলাহাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুল বারিক জানান, পূর্ব বিরোধ ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ছড়ানো গুজবের জেরে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি আরও জানান, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোমস্তাপুর সার্কেল) মো. হাসান তারেক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মামলার সার্বিক তদারকি করছেন।
গ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি: সংঘর্ষের পর থেকে গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলার এজাহারে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে, ফলে নিরীহ ব্যক্তিরাও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। বর্তমানে এলাকাটি অনেকটা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দা সরোয়ার মাস্টার ও বর্তমান মেম্বার বাবুর ভূমিকা এবং পুলিশের তাৎক্ষণিক তৎপরতাকে এলাকাবাসী প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখছেন। তারা দাবি জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন।
আপনার মতামত লিখুন