গলাচিপায় অবরুদ্ধ করে বৃদ্ধ দম্পতির ৪৬ লাখ টাকার জমি দখল
পটুয়াখালীর জেলার গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নে এক অসহায় প্রবীণ হিন্দু দম্পতিকে জিম্মি ও প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা মূল্যের বসতভিটা ও জমি জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সজল বিশ্বাস (সজল মাস্টার) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুধু জমি কেড়ে নেওয়াই নয়, ঘটনার পরপরই ওই দম্পতিকে তড়িঘড়ি করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীর সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের সহায়-সম্বলহীন করে দেশছাড়া করার এই ঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর রায়, তারপরই প্রতারণার ফাঁদ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডাকুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিচিত্র ভূঁইয়া ও তার স্ত্রী মিলা রানী দীর্ঘদিন ধরে তাদের পৈতৃক জমি নিয়ে একটি মামলা লড়ছিলেন। তাদের সন্তানরা ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করায় এই বৃদ্ধ দম্পতি দেশেই একা থাকতেন। গত ১৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে আদালত দীর্ঘদিনের ওই মামলার রায় বিচিত্র ভূঁইয়ার পক্ষে দেন।
মামলায় জয়ী হওয়ার পর জমির রেকর্ড ও দাখিলা (ভূমি কর) সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য তারা প্রতিবেশী সজল বিশ্বাসের (পিতা: মৃত ক্ষিতীশ চন্দ্র বিশ্বাস) সহযোগিতা নেন। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী হওয়ায় তারা সজলকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলেন। আর এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই সজল তার প্রতারণার জাল বিছায়।
ঘরের ভেতর জিম্মি করে দলিল ও টিপসই গ্রহণ
ভুক্তভোগীদের নিকটজন ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, জমির কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন করার অজুহাতে গত ৭ মে, ২০২৬ (বুধবার) সজল বিশ্বাস ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে নিজের বাড়িতে খাবারের আমন্ত্রণে ডেকে নেন। সেখানে বহিরাগতদের সহায়তায় বিচিত্র ভূঁইয়া ও তার স্ত্রীকে ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ ও জিম্মি করা হয়। পরে প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক দলিলে স্বাক্ষর ও টিপসই নেওয়া হয়।
এর পরের দিন, ৮ মে (বৃহস্পতিবার) তাদের গলাচিপা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চাপের মুখে রেখে তাদের ১ একর ৩৮ শতাংশ জমির মধ্য থেকে ৪৬ শতাংশ জমি সজল বিশ্বাসের নামে লিখে দিতে বাধ্য করা হয়।
৪৬ লাখের জমি মাত্র ৭ লাখে, এরপরই তড়িঘড়ি দেশছাড়া
এলাকাবাসী জানান, বাজারমূল্য অনুযায়ী ওই জমির বর্তমান দাম প্রায় ৪৬ লক্ষ টাকা। কিন্তু সজল বিশ্বাস ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জমির মূল্য বাবদ জোর করে তাদের মাত্র ৭ লক্ষ টাকা ধরিয়ে দেন, যা শতাংশ প্রতি মাত্র ১৫ হাজার টাকা দড়ায়। জমিটি সম্পূর্ণ নিজের নামে লিখে নেওয়ার পরপরই সজল বিশ্বাস ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে দেন; যেন তারা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কোনো আইনি আশ্রয় বা অভিযোগ করতে না পারেন।
কে এই সজল বিশ্বাস?
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত সজল বিশ্বাসের পৈতৃক বাড়ি বরিশাল জেলার গৌরনদীতে। সজলের বাবা মৃত ক্ষিতীশ চন্দ্র বিশ্বাস ও মা তারা রানী স্থানীয় নিঃসন্তান ব্যক্তি রাজকুমার গাইনের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। রাজকুমার গাইনের কোনো সন্তান না থাকায় সজলের মাকে তিনি পালিত মেয়ে হিসেবে রাখতেন।
পরবর্তীতে ক্ষিতীশ চন্দ্র বিশ্বাস বাড়ি দেখাশুনার কাজ করতে এসে মৃত নারায়ণ গাইনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। নারায়ণ গাইনের কোনো সরাসরি ওয়ারিশ না থাকায় এবং সজলের মা পালিত মেয়ে হওয়ার সুবাদে, সজল বিশ্বাস নানার বাড়ির সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করে এলাকায় জেঁকে বসেন।
অভিযুক্তের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী
স্থানীয়দের অভিযোগ, সজল বিশ্বাস এলাকায় আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। নানার বাড়ির কথিত জমির দোহাই দিয়ে তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাড়ির ওপর দিয়ে কাউকে যাতায়াত করতে দিচ্ছেন না এবং প্রতিবেশীদের সাথে প্রতিনিয়ত উগ্র ও আপত্তিকর আচরণ করছেন।
সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি
জমি হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দেশছাড়া হওয়া এই বৃদ্ধ দম্পতির পক্ষে এখন ফুঁসে উঠেছে পুরো এলাকা। স্থানীয় জনতা ও ভুক্তভোগীদের আত্মীয়-স্বজনরা এই জালিয়াতির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সজল বিশ্বাসের মতো দখলদার ও প্রতারকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ জমি পুনরুদ্ধারের জন্য তারা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন