বাঁশখালীতে ভয়াবহ বন্যা: উদ্ধারের অপেক্ষায় পানিবন্দি মানুষ
টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং সাগরের জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি বর্তমানে পানির নিচে। এতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে বাঁশখালীর প্রধান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পুরো উপজেলা এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন।
সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
বুধবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়কের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হতে শুরু করলে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শতাব্দীর ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রধান সড়কে পানি ওঠায় যাতায়াত ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক হাঁটু থেকে কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে আছে। টানা বৃষ্টির কারণে গত তিন-চার দিন ধরে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উপকূলজুড়ে বেড়িবাঁধ ভাঙনের শঙ্কা
সাগরের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। ছনুয়া, শেখেরখীল, বড়ঘোনা, গন্ডামারা, সরল, খানখানাবাদ ও প্রেমাশিয়া এলাকার বেড়িবাঁধগুলোতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জোয়ারের প্রবল ঢেউয়ে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে জনপদ প্লাবিত করতে পারে।
মানবিক বিপর্যয় ও খাদ্য সংকট
পানিবন্দি এলাকায় রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধের অভাব দেখা দিয়েছে। মাটির তৈরি পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষ গবাদি পশু নিয়ে পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও উদ্ধার তৎপরতা
উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মসজিদে মাইকিং করে সতর্কতা প্রচার করা হচ্ছে। বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল পানিবন্দি মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত রেখেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছামাত্র দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য জানান, তিনি দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ভবিষ্যতে খাল খনন ও স্লুইস গেট সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
দুর্গতদের দাবি
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বাসিন্দারা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা উল্লেখ করে বাঁশখালীকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি:
জরুরি ত্রাণ সহায়তা: পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির দ্রুত সরবরাহ।
চিকিৎসা সেবা: দুর্গত এলাকায় ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম মোতায়েন।
উদ্ধার কার্যক্রম: উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরদার করা।
স্থায়ী সমাধান: জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-ছড়া খনন ও বেড়িবাঁধ সংস্কারে স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ।
বাঁশখালীর বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, এমন ভয়াবহ বন্যা তারা অতীতে কখনো দেখেননি। দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জোরালো উদ্যোগ না নিলে মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
আপনার মতামত লিখুন