জুলাইয়ের একদিন: কাঁদানে গ্যাস, আতঙ্ক আর বেঁচে ফেরার গল্প — সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম
দিনটি ছিল ২৪ এর ২০ জুলাই। অন্য দিনের মতোই সকালে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। তখন আমি বাংলার চোখ পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ সদর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। তবে সেদিনের সকালটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। চাষাঢ়া এলাকায় সকাল থেকেই ছাত্রদের আন্দোলনে মুখর ছিল রাজপথ। মিছিলের পর মিছিল আর বিভিন্ন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।
সকাল ১০টা পর্যন্ত পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে চাষাঢ়া গোলচত্বরে ছাত্ররা আন্দোলনের পক্ষে জোরালো স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আমি ও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সমবায় মার্কেট ও প্রান্তিক পেট্রোল পাম্পের মাঝামাঝি একটি উঁচু স্থানে অবস্থান নিই, যেখান থেকে ভিডিও ও ছবি ধারণ করা সহজ ছিল।
সেখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল—একদিকে পুলিশ আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে, অন্যদিকে ছাত্ররা আন্দোলন আরও জোরদার করতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয়। ছাত্ররা পিছু হটতে না চাইলে শুরু হয় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ।
গ্যাসের তীব্রতায় আমরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মার্ক টাওয়ারের পাশের একটি পুরির দোকানে ঢুকে পড়ি। কয়েক মিনিট সেখানে অবস্থান করি। বারবার পানি খাচ্ছিলাম, কারণ চোখ ও গলা প্রচণ্ড জ্বালা করছিল। এমন সময় দোকানের বাইরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। চারদিকে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে দোকান লক্ষ্য করেও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দোকান মালিক দ্রুত শাটার নামিয়ে দেন। কিন্তু তাতেও নিরাপত্তা মিলেনি। শাটারের ফাঁক দিয়ে বাইরে থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। দোকানের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ ক্যাশিয়ার অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং বলে ওঠেন, “আমাকে ধর, আমি পড়ে যাচ্ছি।”
চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। উপস্থিত কয়েকজন মিলে কোনোমতে তাকে পাশের গোপাল জিউর বিগ্রহ মন্দিরে নিয়ে যাই। আমিও কয়েকজনের সঙ্গে আশ্রয় নিই মন্দিরে। কিন্তু সেখানেও কিছুক্ষণ পরপর কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া এসে পৌঁছাচ্ছিল। আমরা বারবার মুখে ও চোখে পানি দিচ্ছিলাম, তবুও জ্বালা কমছিল না।
মন্দিরের দায়িত্বে থাকা প্রায় সত্তরোর্ধ্ব এক ব্যক্তি আমার পরিচয় জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি আমাদের সেখানে অবস্থানের অনুমতি দেন। কিন্তু কাঁদানে গ্যাসের তীব্রতা এতটাই ছিল যে চোখ-মুখ জ্বলছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। একসময় একটি বেঞ্চে শুয়ে পড়ি। প্রায় এক ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার পরও শরীর স্বাভাবিক হয়নি। বাইরে তখনও টিয়ারশেলের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
বেলা প্রায় আড়াইটার দিকে মন্দিরের ওই বৃদ্ধ আমাদের জানান, পেছনের দিকে একটি সরু রাস্তা রয়েছে। তার পরামর্শ অনুযায়ী আমি আরও দুজনের সঙ্গে পশ্চিম পাশের একটি সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে যাই। অনেক কষ্টে বাসায় ফিরি। ফিরে প্রথমেই সহকর্মী সাংবাদিকদের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু বাসায় এসে টানা তিন ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার পরও কাঁদানে গ্যাসের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।
২০ জুলাইয়ের সেই দিনটি শুধু একজন সংবাদকর্মীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নয়; এটি ছিল জীবন বাঁচানোর লড়াইও। সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সেদিন ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। আজও সেই দিনের কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজ, আতঙ্কিত মানুষের ছুটে চলা আর টিয়ারশেলের শব্দ স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।
আপনার মতামত লিখুন