নারায়ণগঞ্জে পশুর হাট ঘিরে বিএনপি-এনসিপি ‘সিন্ডিকেট’: রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় কোরবানির পশুর হাট ইজারাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে এক অঘোষিত 'সমঝোতা সিন্ডিকেট' গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক আদর্শে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিলেও, হাট ইজারার ভাগাভাগিতে দুই দলের নেতাদের মধ্যে রয়েছে চমৎকার মিল। এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকারি রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সমঝোতার নেপথ্যে ‘কমিশন বাণিজ্য’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফতুল্লা ডিআইটি মাঠের পর এবার সদর উপজেলার ১৩টি পশুর হাটেই এই সমঝোতা কার্যকর হয়েছে। কোথাও বিএনপি ও এনসিপি নেতারা পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন, আবার কোথাও ১০ থেকে ১২ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে রফাদফা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সদর উপজেলার ১৩টি হাটের সবকটির বিপরীতেই এনসিপি নেতারা দরপত্র কিনেছিলেন। কিন্তু পরে সমঝোতা হওয়ায় অন্য কোনো প্রতিযোগী দরপত্র জমা দিতে সাহস পাননি। যেমন:
আলীগঞ্জ হাট: এনসিপি নেতাদের সঙ্গে ১০ শতাংশ কমিশনের চুক্তি হয়েছে।
অন্যান্য হাট: গোগনগর বাড়িরটেক, তালতলা, সাইনবোর্ড ও ভূইগড় সোনালী সংসদ হাটেও ১০-১২ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে সমঝোতা হয়েছে।
পার্টনারশিপ: কাশীপুর, বক্তাবলী ও মার্কাজ মসজিদ সংলগ্ন হাটে বিএনপি নেতারা সরাসরি টাকা লগ্নি করে অংশীদার হয়েছেন।
একক দরপত্রে ইজারার চিত্র
সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটাই স্পষ্ট যে, ১৩টি হাটের মধ্যে ৭টিতে মাত্র একটি করে দরপত্র জমা পড়েছে। দুটি হাটে একাধিক দরপত্র জমা পড়লেও তা ছিল 'সাজানো'। সরকারি মূল্যের চেয়ে নামমাত্র বেশিতে হাটগুলো ইজারা নেওয়া হয়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:
| হাটের নাম | সরকারি সর্বনিম্ন দর (টাকা) | ইজারার দর (টাকা) | ব্যবধান |
| সাইনবোর্ড শান্তিধারা | ১৬,৫০,০০০ | ১৬,৭৫,০০০ | ২৫,০০০ |
| গোগনগর বাড়িরটেক | ৭,৫০,০০০ | ৭,৬০,০০০ | ১০,০০০ |
| অফসার ওয়েল মিল সংলগ্ন | ৭,০৫,০০০ | ৭,৫০,০০০ | ৪৫,০০০ |
| মার্কাজ মসজিদ সংলগ্ন | ২,৪২,৫০০ | ২,৬০,০০০ | ১৭,৫০০ |
| বক্তাবলী বাজার সংলগ্ন | ১,৭০,০০০ | ১,৭৫,০০০ | ৫,০০০ |
নেপথ্যে কার কলকাঠি?
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এনসিপি নেতা তরিকুল মূলত এসব হাটের দেখভাল করছেন। টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুর আগে বিএনপি ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়। ফতুল্লা ডিআইটি মাঠের ইজারা নিয়ে শুরুতে ৩০ শতাংশ কমিশন দাবি করলেও, পরে তা ১০ শতাংশে নেমে আসে। সমঝোতার অভাবে ২১ এপ্রিল বক্তাবলীর রাজাপুর খেয়াঘাটের দরপত্র নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটলেও, পশুর হাটের ক্ষেত্রে সমঝোতাই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে।
বিএনপি নেতারা জানান, রোজার ঈদ থেকেই তারা হাটগুলোর জন্য বিনিয়োগ করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এনসিপি নেতাদের বোঝানো হয় যে, বিএনপি হাট না পেলে এনসিপি নিজেরা সেটি পরিচালনা করতে পারবে না। এই যুক্তিতেই শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়।
বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এভাবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই ইজারা সম্পন্ন হওয়ায় সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ ব্যবসায়ীরা দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন