নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানায় পুলিশের শেল্টারে ৫০ মাদক স্পটে রমরমা ব্যাবসা
নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অন্তত ৫০ মাদক স্পট থেকে মাসোহারা আদায়ের পাশাপাশি মাদক ব্যাবসায়ীদের শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধে।
ডেইলি, সাপ্তাহিক ও মাসিক চুক্তিতে ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন থানার অফিসারেরা।এমনকি চিহ্নিত মাদক ব্যাবসায়ীদের পরিবারের নারীদের সঙ্গে দু’একজন অফিসারের অনৈতিক সম্পর্কে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।যতদ্রুত সম্ভব এসব অসাধু অফিসারদের অপসারণ করার পাশাপাশি সামাজিক ব্যাধি মাদকের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করার দাবি জানান সচেতন মহল।
স্থানীয়রা জানান, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তার নীতিহীনতায় ম্লান হচ্ছে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি।তাদের দায়িত্বহীন্তা ও উদাসীনতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। প্রতিনিয়ত ধর্ষণ,ছিনতাই,ডাকাতি, খুনের ঘটনা ঘটছে।পাড়া-মহল্লায় অবাধে মাদকের স্বর্গরাজ্য এবং কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। কিন্তু পুলিশের ভূমিকা কেবলই ‘দায়সারা’।তাই ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু ’ এই স্লোগানটি সাধারণ মানুষের কাছে চরম উপহাসে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, থানার কয়েকজন অসৎ পুলিশ অফিসারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণেই এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে।এদের মধ্যে মাদক বানিজ্য ও সামারিবাজ হিসেবে সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছেন এসআই মো. মনির, এসআই ফারুক হোসেন, এসআই ইদ্রিছ আলী, এসআই শহিদুল ইসলাম।নানা অনিয়ম অসঙ্গতি ও বেআইনী কর্মকান্ডের কারণে এক মাসের বেশি সময় আগে তাদের বদলির আদেশ হয়।কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতায় তারা এখনো বহাল রয়েছেন।তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানার একাধিক অফিসার জানান, খোদ ওসি সাহেব নিজের স্বার্থে তাদেরকে রেখেছেন।তাদের মাধ্যমে সবধরনের অপকর্ম চালানো হচ্ছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন,বন্দর থানায় কী ‘মধু’ লুকিয়ে আছে যে, সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে অসাধু সিনিয়র অফিসারদের ম্যানেজের মাধ্যমে মাসের পর মাস বহাল রয়েছেন এসব দুর্নীতিবাজ অফিসারের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এসআই ফারুক – এসআই ইদ্রিছ জুটি এবং এসআই মনির – এসআই শহিদুল জুটির ঘুষ বানিজ্যের মূল উৎস হচ্ছে প্রকাশ্যে মাদক ও আটক বাণিজ্য।বিশেষ করে ছালেহনগর, ঝাউতলা, সোনাকান্দা, মদনগঞ্জ বেদেপট্টি, দড়ি সোনাকান্দা, নবীগঞ্জ ইস্পাহানীসহ প্রায় ৫০টি মাদক স্পট থেকে তাদের ব্যক্তিগত ‘সোর্স’ ও দালালের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়।
নির্দিষ্ট স্পটগুলো থেকে নিয়মিত মোটা অংকের মাসোহারা পাওওয়ায় থানায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো মামলা হয় না।উল্টো বিভিন্ন কৌশলে মাদক ব্যাবসায়ীদের শেল্টার দেওয়া হয়।এমনকি লোকদেখানো আটকের পর মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত এড্রয়েট মোবাইল ফোনটি গায়েব করে দেয়ার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। লোকদেখানো অভিযানে এছাড়া কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হলেও মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে মাঝপথেই ছেড়ে দেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি দড়ি সোনাকান্দা এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সাগর ও বিউটির ঘরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ তাদেরকে আটক করেন এসআই ফারুক। কিন্তু কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাদের কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ঘুষ নিয়ে পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এদিকে মাহমুদ নগরের মাদক সম্রাজ্ঞী সুফি ও নিঝুম এবং তার স্বামী ওসমানের মাধ্যমে মাদক বানিজ্যের বড় একটা আয় আসে এসআই ফারুক ও মনিরের নামে।একইভাবে, ছালেহনগরের চিহ্নিত মাদক ডিলার সাগরকে গ্রেপ্তার করা হলেও এক রাজনৈতিক নেতার জোর তদবিরে এবং মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া শাহী মসজিদ বউবাজার এলাকার মাদক ব্যবসায়ী সনিকে তল্লাশি করে ৫০ পিস ইয়াবা ও নগদ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করেন এসআই ফারুক ও এসআই ইদ্রিছ। কিন্তু
সনিকে ১০ পিস দিয়ে মামলা দিয়ে বাকি ৪০ পিস ইয়াবা এবং ৩০ হাজার টাকা নিজেরাই গায়ের করে দেন।
দড়িসোনাকান্দার মুন্নী আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শেল্টারদাতা দারোগা মনির,ফারুক ও শহিদুল ইসলামদের বেপরোয়া ঘুষ বানিজ্যের কারণে বহু মাদক মামলার আসামি সুফি, ওসমান ও নিঝুমদের হামলায় নিরীহ তিন ভাই রোমান,আলামিন ও ইমন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।থানার দারোগারাই এসব মাদক ব্যাবসায়ীদের দিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করায় বলে অভিযোগ করেছেন সুমা নামের একজন।
এলাকার সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে যারা অপরাধীদের সাথে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলবেন, তাদেরকে অবশ্যই অপসারণের পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা দরকার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফে উদ্দিন বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে যেকোনো অপরাধে জড়ানোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বদলি একটি অফিসিয়াল প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই তা কার্যকর করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন