পতেঙ্গায় ওয়াসার নতুন সংযোগ: ৬৩ বছরের আক্ষেপ ঘুচল তিন ওয়ার্ডে
স্বাধীনতার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছর পরও নগরীর উপকূলীয় গুরুত্বপুর্ন জনপদ পতেঙ্গার হাজারো মানুষকে সুপেয় পানির জন্য নির্ভর করতে হয়েছে লবণাক্ত টিউবওয়েল কিংবা চড়া দামের কিনে আনা পানির ওপর। অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়াসার পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানায়, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পতেঙ্গায় পানি সরবরাহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেলে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই এই তিন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা ওয়াসার পাইপলাইনের সুপেয় পানির সুবিধা পাবেন।
দীর্ঘদিন ধরে পাইপলাইন জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পতেঙ্গা এলাকায় ওয়াসার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ সম্ভব হয়নি। ফলে নগরীর অংশ হয়েও এই এলাকার বাসিন্দারা আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে থেকে গেছেন। বর্তমানে পুরোনো ও জরাজীর্ণ লাইন সংস্কার এবং নতুন সংযোগ স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম। গত ৩ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পানি সরবরাহ লাইন স্থাপনের অনুমতি চান।
ওয়াসার তথ্যমতে, পতেঙ্গা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। অথচ বর্তমানে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৪ কোটি লিটার। অন্যদিকে বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৬ কোটি লিটার। এই প্রকল্পের পানি বর্তমানে আনোয়ারা, পটিয়া, কর্ণফুলী ও বোয়ালখালী এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন অন্তত ২ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি পতেঙ্গা এলাকায় সরবরাহ করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু পানির সংকটই দূর হবে না, কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। কারণ সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় পতেঙ্গার অধিকাংশ টিউবওয়েলের পানিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা। দীর্ঘদিন ধরে এই পানি ব্যবহারের কারণে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পতেঙ্গার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের আরেকটি বড় চিত্র ছিল পানির বাণিজ্য। ইপিজেড থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত এলাকায় একসময় গড়ে উঠেছিল পানির দোকানের সারি। বড় বড় রিজার্ভারে পানি সংরক্ষণ করে ড্রামভর্তি পানি ভ্যানে করে বিভিন্ন মহল্লায় বিক্রি করা হতো। ২৫ লিটারের একটি ড্রাম ভবনের তলা ভেদে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে বছরের পর বছর। বাধ্য হয়ে হাজার হাজার পরিবার এই পানি কিনেই দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতো।
স্থানীয়দের আশা, বহু প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পতেঙ্গার মানুষের জীবনযাত্রায় আসবে বড় পরিবর্তন। সুপেয় পানির জন্য আর নির্ভর করতে হবে না লবণাক্ত টিউবওয়েল কিংবা ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক পানির ওপর। নগরীর প্রাচীন এই তিন ওয়ার্ড অবশেষে যুক্ত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসার মূল পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কে—যা স্থানীয়দের কাছে এক ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন